গত কয়েক মৌসুমে সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। খাদ্য সংকট নিরসনে সরকারি গুদামে মজুদের জন্য ধান-চাল কৃষক ও মিল পর্যায় থেকে ক্রয়ের জন্য প্রতি কৃষি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা দিলেও বিভিন্ন কারণে তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি বছরে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরে। চট্টগ্রাম বিভাগে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪২ টন ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ১৬ হাজার ২৪৯ টন বা সাড়ে ৯৫ শতাংশ ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান-চাল ক্রয়ে এখনো কিছু সময় বাকি রয়েছে। সেখানে বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ সেদ্ধ চাল ক্রয়ে মাত্র চার-পাঁচদিন সময় লাগবে। প্রতি বছর সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও বিক্রেতাদের দ্রুত অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিলে লক্ষ্যমাত্রার বেশি সংগ্রহ হবে বলে জানান তারা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বোরো মৌসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সাড়ে ১৭ লাখ টন ধান ও চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। এর মধ্যে তিন লাখ টন ধান ও ১৪ লাখ টন সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করার কথা ছিল। এর বাইরে জায়গাবিশেষে আতপ চালও কেনা হবে সীমিত পরিসরে। চলতি মৌসুমে ধান ও চালের দাম কেজিপ্রতি ৪ টাকা বাড়িয়ে ধান ৩৬ ও সেদ্ধ চাল ৪৯ এবং আতপ চাল কেনা হবে ৪৮ টাকা কেজি দরে। ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান-চাল কেনার সময়সীমা আছে।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিচালক মো. সহিদ উদ্দিন মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগে ধান-চাল ক্রয় নিয়ে বিগত বছরগুলোয় নানা সংকট ছিল। তবে চলতি বছরে সময়সীমা শেষের আগেই ধান-চাল ক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পথে। সেদ্ধ চাল কেনা সামান্য বাকি রয়েছে। কয়েক বছর ধরে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও বোরো ধান ক্রয়ে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হবে। গত মৌসুমগুলোয় ধান ক্রয়ে নানা সংকট ছিল। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে বোরো মৌসুমে আতপ চাল ও ধান ক্রয় শতভাগ সম্পন্নের পাশাপাশি সেদ্ধ চালও প্রায় কেনা শেষ হয়েছে। সরকার যদি আরো বেশি কিনতে চায়, সেটিও সম্ভব।’
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোয় ২০২৪-২৫ মৌসুমের জন্য ধান ৪৫ হাজার ৬৯ টন, সেদ্ধ চাল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৮ টন এবং সীমিত পরিসরে আতপ চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয় সরকার। মাঠ পর্যায়ের কৃষক ছাড়াও খাদ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সধারী আতপ ও সেদ্ধ চালের জন্য পাঁচ শতাধিক চালকল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। সর্বশেষ ৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় শতভাগ অর্থাৎ ৪৫ হাজার ৬৯ টন ধান ও ১১ হাজার ৭৮৫ টন আতপ চালের শতভাগ কেনা সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে সেদ্ধ চাল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৮ টনের মধ্যে ক্রয় হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৫ টন। বাকি ১০ হাজার ৩৯৩ টন চাল আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কেনা সম্পন্ন হবে। সব মিলিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪২ টন ধান-চালের মধ্যে ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ২৪৯ টন।
অন্যদিকে ২০২৩-২৪ মৌসুমে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭২৩ টন ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ক্রয় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টন। যেখানে ধান ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সম্ভব হয়নি। ২০২২-২৩ বা তার আগের মৌসুমেও বোরো ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, মাঠ পর্যায়ের ধান খাদ্যগুদামে সংগ্রহ করা হয়। ধান ক্রয়ের সময় ভেজা, আর্দ্রতা বেশি, চিটার পরিমাণসহ বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা করে তার পরই কেনা হয়। ধান ভালো করে যদি না শুকানো হয় এবং আর্দ্রতা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের বেশি হলে সেই ধান কেনা সম্ভব হয় না। চিটার পরিমাণ মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়। ধান বিক্রির টাকা সরকারি পর্যায়ে পেতে দেরি হওয়ায় অনেকে আগ্রহী হন না।
কৃষকরা বলছেন, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রিতে হয়রানির শিকার হতে হয়। তাছাড়া ধানের টাকা পেতেও সময় লাগে। যারা ধান সংগ্রহ করেন তারা আমাদের পরিচিত হওয়ায় তাদের কথাও রাখতে হয়। দ্রুত বিক্রি করে আমরা টাকা পাব—এ কারণে ধান গুদামে বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে দামও গত বছরের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিক্রিতে সমস্যা হয়নি।